বাংলাদেশে জুয়ার বিস্তার রোধ ও সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত জটিল ও দ্বিমুখী। একদিকে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জুয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালায়, অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার বিশেষ কিছু কোর্সে জুয়ার অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার সুযোগ থাকে। বাস্তবতা হলো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য জুয়া作为一项社会问题কে চিহ্নিত করা, কিন্তু ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রভাবে এর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় শিক্ষাক্রমে জুয়ার কুফল সম্পর্কে অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত আছে। উদাহরণস্বরূপ, মাধ্যমিক স্তরের সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে “সামাজিক সমস্যা” অধ্যায়ে জুয়াকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, এই শিক্ষা খুবই তত্ত্বনির্ভর। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নবম-দশম শ্রেণির মাত্র ২৫% শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবই থেকে প্রাপ্ত জুয়া সংক্রান্ত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সক্ষম। বাকিরা এটিকে শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাসের জন্য একটি পাঠ্য হিসেবেই মনে রাখে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও অর্থনীতির বিভাগগুলোতে জুয়াকে একটি আচরণগত ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ২০২২ সালে একটি গবেষণা চালায় যা দেখায় যে, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকছে এমন তরুণদের মধ্যে ৬৮% বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া শিক্ষার্থী। এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, শুধুমাত্র তাত্ত্বিক শিক্ষা জুয়ার আসক্তি রোধে যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সক্রিয়ভাবে কাউন্সেলিং সেবা এবং এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শুধু ক্লাসরুম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনার ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করে। নিম্নোক্ত সারণিটি ২০২৪ সালে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জুয়া ও আসক্তি বিষয়ক আয়োজিত কর্মশালার একটি পরিসংখ্যান প্রদর্শন করছে:
| বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম | আয়োজিত কর্মশালার সংখ্যা | অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর আনুমানিক সংখ্যা | বিষয়বস্তুর ধরন |
|---|---|---|---|
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ৫ টি | ৭৫০ | মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, আর্থিক ব্যবস্থাপনা |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় | ৩ টি | ৪০০ | সাইবার সিকিউরিটি, অনলাইন প্রতারণা সচেতনতা |
| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় | ২ টি | ৩০০ | আইনগত দিক, জুয়া সম্পর্কিত ফৌজদারি আইন |
| চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় | ৪ টি | ৫০০ | জুয়ার সামাজিক প্রভাব, পরিবার ও সম্প্রদায়ের ভূমিকা |
যাইহোক, একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল লিটারেসির অভাব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ঐতিহ্যবাহী জুয়ার (যেমন: কার্ড গেম, দাদন) কুফল নিয়ে আলোচনা করে, কিন্তু অনলাইন জুয়ার জটিল পদ্ধতি এবং এর মার্কেটিং কৌশল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেমন কিছু বাংলাদেশ জুয়া সাইট, অত্যন্ত আকর্ষণীয় ইন্টারফেস এবং প্রতিশ্রুতিশীল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের আকর্ষণ করে। শিক্ষার্থীরা প্রায়শই এগুলিকে বিনোদন বা দ্রুত টাকা কামানোর একটি সহজ উপায় হিসেবে ভুল বুঝতে পারে, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে এ ধরনের আধুনিক হুমকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় না।
এছাড়াও, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটার সায়েন্স বা আইটি-র শিক্ষার্থীরা অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের কার্যপ্রণালী, র্যান্ডম নাম্বার জেনারেশন (RNG) এবং এর সম্ভাব্য দুর্বলতা সম্পর্কে শেখে। এই জ্ঞান যদি নৈতিকতার সাথে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা জুয়া প্রতিরোধে টুল ডেভেলপমেন্টে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী এই জ্ঞান ব্যবহার করে অবৈধ গেমিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে প্রলুব্ধ হতে পারে।
পরিশেষে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল একটি সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের শেখানো উচিত কিভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়, কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কীভাবে প্রলোভন প্রতিরোধ করতে হয়। এটি শুধুমাত্র জুয়া নয়, জীবন管理的 অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাদের সাহায্য করবে। বাস্তবসম্মত শিক্ষা, অভিজ্ঞতামূলক শেখার পদ্ধতি এবং প্যারেন্ট-টিচার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা ছাড়া জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সীমিতই থেকে যাবে। স্কুল-কলেজের গেট দিয়ে বেরিয়েই শিক্ষার্থীরা যখন সামাজিক মাধ্যম বা বন্ধুদের চাপে অনলাইন জুয়ার মুখোমুখি হয়, তখন ক্লাসরুমের তত্ত্বকথা খুব সহজেই ম্লান হয়ে যেতে পারে।